লাখ টাকার দর্জিঃ উদ্যোক্তা হয়ে উঠার অসাধারণ গল্প

ruby ashraf diamu

স্বামীর কর্মস্থল Huoston এর Rice University তে এক ক্রিসমাস পার্টিতে একটি মেয়ের জামা সবার নজর কাড়ে। যেই দেখছিল সেই উচ্চকণ্ঠে প্রশংসা করছিলো। সবার জিজ্ঞাসু মনে একটাই প্রশ্নঃ কোথায় পাওয়া যাবে এই রকম ড্রেস? সত্যিটা হল এই, মেয়েটি কোন নামীদামী ফ্যাশন হাউজ থেকে নয় বরং নিজেই ডিজাইন করে বানিয়েছিল তার পার্টি ড্রেস।

 তোমার সত্যিকারের প্রতিভা আছে, তুমি চাইলেই এই ধরনের জামা বিক্রি করতে পারো। সবার উচ্চকিত প্রশংসা। মেয়েটি কি সেদিন  নিজেই ভেবেছিল একদিন ১০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের কোন ফ্যাশন ডিজাইনিং হাউজের মালিক হবে সে?

বলা হচ্ছে রুবি আশরাফ এর কথা। Precious Formals ফ্যাশন হাউজের  CEO।  ফ্যাশন ক্লথিং বিজনেস এর মত চ্যালেঞ্জিং পেশার মানুষ  হলেও  রুবি আশরাফ এর প্রথম জীবন মোটেও  এই পথে ছিল না । ছিলেন বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী। ভর্তি হয়েছিলেন মেডিকেল স্কুলে। আর সব ভবিষ্যৎ সফল উদ্যোক্তার মত রুবি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন স্বাধীনচেতা। মেডিকেল স্কুলের অ্যানাটমির খটর মটর তার ভাল লাগেনি। তাই মেডিকেল এর পাট চুকিয়ে পরের বছরেই ভর্তি হয়ে যান দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ব্যাচেলর আর মাস্টার্স করেন এখান থেকেই।
বাবার স্বপ্ন একবার ভেঙ্গেছিলেন মেডিকেল এ পড়াশুনা শেষ না করে। এইবার বাবার একটি আবদার তিনি রাখলেন। ভর্তি হলেন ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট আহমেদাবাদ ক্যাম্পাসে এমবিএ প্রোগ্রামে। উদ্যোক্তা হওয়ার উপর কোন কোর্স করেননি, কিন্তু রুবি জানতেন ৪-৫ বছর চাকরি করে তিনি আসলে নিজের কোন উদ্যোগেই মনোযোগী হবেন।
১৯৮৭ সালে জাভেদ আশরাফকে বিয়ে করে পাড়ি জমান সুদূর আমেরিকায়। রাইস ইউনিভার্সিটিতে সুযোগ পেয়েছিলেন কিন্তু তার মন পড়েছিল হার্ভার্ড নয়তো স্টানফোর্ডে। কিন্তু ভাগ্যবিধাতা হয়তো তার নিয়তি অন্যভাবে লিখছিলেন। সেই ক্রিসমাস পার্টির পর স্বামীর বসের স্ত্রীর জন্যেও একটি ড্রেস ডিজাইন করে দিয়েছিলেন বিশেষ অনুরোধে। রুবি যেন আস্তে আস্তে নিজের জীবনের পথরেখা খুঁজে পেতে লাগলেন।
তখনকার দিনে টেক্সটাইল, ভোগ্য পণ্য এসবের উপর লেখাপড়ার সুযোগ থাকলেও হালের ফ্যাশনের উপর ওইভাবে তথ্য পাওয়া যাচ্ছিলোনা।  আর তাই  রুবি নিজেই শুরু করলেন গবেষণা । বিভিন্ন দোকানে ঘুরে ঘুরে ফ্যাশনের লেটেস্ট ট্রেণ্ড কি, কি ধরনের কাপড় বিক্রি হচ্ছে এসব বোঝার চেষ্টা করতেন । এইরকমভাবে দোকানে দোকানে ঘোরাঘুরি তার বৃথা যায়নি। রুবি বুঝে ফেললেন সান্ধ্যকালীন পার্টি ড্রেস এর দাম অন্যান্য আটপৌরে পোশাকের চেয়ে বেশি। আর এর চাহিদাও আছে বাজারে বেশ ভালোই।
শুরুটা করলেন পরিচিত বন্ধু মহল থেকেই। কথা ছড়াতে সময় নেয়না। ব্যক্তিগত পরিচয়ের গণ্ডির বাইরেও অনেকেই আসে তার কাছে ডিজাইন করিয়ে নিতে। আস্তে আস্তে কিছু দোকান থেকেও তার কাছে অর্ডার আসতে শুরু করে।
চাহিদা বাড়ছে তার ডিজাইনের। একইসাথে রুবির মনে উঁকি দিচ্ছে নিজের উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন। রাইস ইউনিভার্সিটির প্রফেসর স্বামীকে নিয়ে ফিরে এলেন ইন্ডিয়া। দিল্লীতে দুজনে মিলে দিয়ে দিলেন ফ্যাক্টরী। কারণ আমেরিকাতে এই রকম একটি ফ্যাক্টরী আর মজুরির দাম তাদের সাধ্যাতীত ছিল। রুবি আশরাফ রীতিমতোন স্কুলে গিয়ে বেসিক সেলাই ফোড়ন শিখেছেন এই সময়টাতে। স্বামী জাভেদ আশরাফ ও বাদ যাননি।

 শুরুর সেই কঠিন দিনগুলোতে রুবির কাছে সাফল্যের মূলমন্ত্র ছিল আপনি যাই বিক্রি করুন না কেন ব্যবসার প্রাথমিক ধাপে আপনাকে যেতে হবে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। তাদের কাছে আপনার পণ্যকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে। তাদের বুঝতে হবে আপনি যেই হউন না কেন,যেখান থেকেই হউন না কেন আপনার প্রতিটা কথাই সত্য, আপনি দায়িত্ববান এবং আসলেই পণ্যগুলো ঠিকঠাক পাঠিয়ে দিবেন। যদি নিজেকে বিক্রি করতে পারেন, তবে পণ্যও বিক্রি করতে পারবেন।

৫০০০ ডলার দিয়ে শুরু করা এই দম্পতি ধীরে ধীরে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ শুরু করেন। ইণ্ডিয়াতে দক্ষ কর্মী ও মেশিনারিজ এর অভাবে চায়নাতে ফ্যাক্টরি শিফট করলেন। ততদিনে ব্যবসা মোটামুটি দাঁড়িয়ে গেছে। পেয়েছেন কিছু ব্যাংক লোনও।

রুবির রয়েছে পাখির চোখ। ফ্যাশন বিজনেস এর ধরনটাই এমন যে পরের শীতের ট্রেন্ড এই শীতেই আপনাকে ধরতে হবে। সময়ে অসময়ে তাকে বদলাতে হয়েছে ব্যবসার গতি প্রকৃতি। একারণে প্রেশাস ফর্মাল এর আছে হরেক রকম এর পণ্য। প্রম ড্রেস থেকে শুরু করে নববধূর বিয়ের ড্রেস সবকিছুই তিনি বিক্রি করেন। আটলান্টায় আছে ১০,০০০ বর্গফুটের নিজেদের শোরুম। এছাড়াও বিক্রি করেন বিভিন্ন রিটেইলার এর শোরুম থেকে। ইউরোপ অবধি বিস্তৃত তার ব্যবসার পরিধি।

ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে আমরা দেখেছি, বিজয়ী পুরুষের পাশে সাহস দিয়েছে বিজয়লক্ষ্মী নারী। এখানের গল্পটা যেন একটু ভিন্ন। স্বামী জাভেদ আশরাফের কাছে পেয়েছেন সবধরনের সাহায্য। ব্যবসাতেও তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী তার স্বামী। পুরো ব্যবসার অ্যাকাউন্টস, মার্কেটিং, ফিন্যান্স, ম্যানেজমেন্ট দেখভাল করেন জাভেদ আশরাফ নিজেই। শখের ফটোগ্রাফি বিদ্যা কাজে লাগান ফ্যাশন ফটোগ্রাফি করে।

এই হল রুবি আশরাফের গল্প। প্রেশাস ফর্মালের রুবি আশরাফ আজকের ফ্যাশন জগতে একজন প্রেশাস উদ্যোক্তা বটে। মেধা আর সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে নিয়ে গেছেন সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে। এইরকম অনেক সুপ্ত সৃষ্টিশীল উদ্যোক্তা হয়তো আমাদের মাঝেই আছেন।

 

Collected

Diamu Blog Team

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *